বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব

ধনী দেশগুলোয় প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার পূর্বাভাস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বাণিজ্য নীতির প্রভাব হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ২০২৫ সাল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বাণিজ্য নীতির প্রভাব হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ২০২৫ সাল। জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করে আক্রমণাত্মক শুল্কনীতি প্রয়োগের ঘোষণা দেন তিনি, যা কিনা বিশ্বকে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পথে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। এরই মধ্যে আর্থিক বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব ফুটে উঠেছে। এ বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরো বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরো খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি)। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্যারিসভিত্তিক ৩৮টি ধনী দেশের এ জোট বেশির ভাগ সদস্যের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। খবর দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।

সংশোধিত পূর্বাভাস অনুসারে, বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে হতে পারে ৩ দশমিক ১ ও আগামী বছর ৩ শতাংশ। কারণ বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা ও অনিশ্চয়তা। এর আগে ডিসেম্বরে পূর্বাভাসে বলা হয়, ২০২৫ ও ২৬ সালে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখবে বিশ্ব। তবে ২০২৪ সালে ৩ দশমিক ২ শতাংশ সম্প্রসারণ হয় বৈশ্বিক অর্থনীতির।

একাধিক বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে এবারের পূর্বাভাস দিয়েছে ওইসিডি। এর অগ্রভাগে রয়েছে চীন-মার্কিন চলমান বাণিজ্যবিরোধ এবং ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কানাডা ও মেক্সিকোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি ওই দেশগুলোর পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাবনা। তবে ট্রাম্পের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপের মতো কিছু হুমকি এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলো এখনো রয়ে গেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরো বিভাজন এখন প্রধান উদ্বেগের বিষয়। বাণিজ্য বাধার আরো বিস্তৃত ও উচ্চমাত্রার বৃদ্ধি বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াবে।

বাণিজ্যযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির গতি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একের পর এক শুল্কবাধা তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা সংশোধনের আগে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জন্য আগে ২ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হলেও সংশোধনের পর ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব বাদ দিয়ে হিসাব করলে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ২০১১ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধি।

যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার মেক্সিকো, কানাডা ও চীন সব ধরনের শুল্কবাধার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে মেক্সিকোর অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। শুল্ক বৃদ্ধির ফলে চলতি বছর দেশটির অর্থনীতি ১ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং ২০২৬ সালে দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হবে। এর আগে দেশটির জন্য যথাক্রমে ১ দশমিক ২ ও ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল ওইসিডি।

কানাডায় ২০২৫ ও ২৬ সালের জন্য ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হলেও সংশোধনের পর দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। অবশ্য অভ্যন্তরীণ নীতিগত সহায়তা শুল্কের প্রভাবকে প্রশমিত করায় চীনা অর্থনীতি সাময়িকভাবে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবে ২০২৬ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি ধীর হবে। ইউরোপীয় অর্থনীতি সরাসরি বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব এখনো কম অনুভব করছে, তবে অনিশ্চয়তার কারণে ওইসিডি এখানেও পূর্বাভাস কমিয়েছে।

পূর্বাভাস অনুসারে, উচ্চ আমদানি খরচের কারণে আগে দেয়া পূর্বাভাসের তুলনায় বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য কঠোর নীতি বা উচ্চ সুদহার বজায় রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে ২০২৬ সালেও মূল্যস্ফীতির হার নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি থাকবে।

ওইসিডির একটি পরীক্ষামূলক মডেলিং অনুযায়ী, যদি দ্বিপক্ষীয় শুল্ক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়, তবে তিন বছরের মধ্যে বৈশ্বিক উৎপাদন প্রায় দশমিক ৩ শতাংশ কমতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে উৎপাদন কমে যেতে পারে দশমিক ৭ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাবে, ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কঠোর নীতি গ্রহণ করবে এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।

ওইসিডির মহাসচিব ম্যাথিয়াস কোরম্যান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করছি, যার মধ্যে আরো বাণিজ্য বিভাজন বা ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উত্তেজনা অন্তর্ভুক্ত।"সামনে যদি একই রকম আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তবে অবশ্যই আমাদের পূর্বাভাস সংশোধন করতে হবে।’

অবশ্য সংস্থাটি বলেছে, যদি শুল্ক হ্রাস পায় ও নীতি আরো স্থিতিশীল হয়, তাহলে কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনাও থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে, ইউরোপে প্রতিরক্ষা খরচ বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি সরকারগুলোর বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

ওইসিডির প্রতিবেদনে পরামর্শ আকারে বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক উদ্বেগগুলোর একসঙ্গে সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা উচিত সরকারগুলোর। যাতে দেশগুলোর মধ্যে পাল্টা বাণিজ্য বাধা আরোপের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ে।

আরও